তথ্য ও প্রযুক্তি

আন্তজার্তিক রেডিও সম্প্রচার একে একে তাদের সম্প্রচার বন্ধ করছে। বাংলাদেশ বা ভারতের রাষ্ট্রীয় বেতারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কেমন।

রেডিওর কি ভবিষ্যত?

আন্তর্জাতিক রেডিওর সংক্ষিপ্ত হয়ে আসার কারণ

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, ভয়েস অব আমেরিকা (VoA), ডয়চে ভেলে (DW) বা রেডিও দ্যুচে ভেলে-এর মতো ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো তাদের অ্যানালগ শর্টওয়েভ (SW) সম্প্রচার প্রায় গুটিয়ে এনেছে বা বন্ধ করে দিয়েছে। এর মূল কারণগুলো হলো:

  1. শর্টওয়েভ প্রযুক্তির ব্যয়: শর্টওয়েভ ও মিডিয়ামওয়েভ (AM) ট্রান্সমিটার চালাতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হয়, যার বিপরীতে শ্রোতাসংখ্যা অ্যানালগে দিন দিন কমে আসছে।

  2. ডিজিটাল রূপান্তর: বিশ্বের প্রায় সব আন্তর্জাতিক সংস্থাই ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকেছে। পডকাস্ট, অন-ডিম্যান্ড অডিও, মোবাইল অ্যাপ এবং লাইভ স্ট্রিম প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা বহু দূরে থাকা শ্রোতার কাছে অনেক কম খরচে এবং উন্নত অডিও কোয়ালিটিতে পৌঁছাতে পারছে।

  3. স্যাটেলাইট ও স্মার্টফোন প্রযুক্তি: ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা আন্তর্জাতিক অডিও কনটেন্টের মূল মাধ্যম হিসেবে রেডিও তরঙ্গের জায়গা দখল করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ বেতার ও আকাশবাণীর বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ

১. বাংলাদেশ বেতার

  • বর্তমান অবস্থা:

    • AM চ্যানেল: বাংলাদেশ বেতারের অনেক আঞ্চলিক কেন্দ্রের পুরনো মিডিয়ামওয়েভ (AM) ট্রান্সমিটার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং শ্রোতা কম থাকায় AM ফ্রিকোয়েন্সির উপর নির্ভরতা কমানো হচ্ছে।

    • FM ও ট্রাফিক সার্ভিস: শহরে এবং গাড়িচালকদের কাছে এফএম চ্যানেল (যেমন: ট্রাফিক এফএম ৮৮.৮) এবং এফএম ব্যান্ডভিত্তিক সংগীত বা কথিকা অনুষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি জনপ্রিয়।

    • ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: বেতারের নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ডিজিটাল অডিও সম্প্রচারের উদ্যোগ রয়েছে।

  • ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:

    • রাষ্ট্রীয় জরুরি বার্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা) ও প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে রেডিওর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

    • তবে প্রথাগত AM সম্প্রচার পুরোপুরি গুটিয়ে এনে FM কভারেজ বৃদ্ধি এবং অনলাইন রেডিও/পডকাস্টিং রূপান্তর না করলে শ্রোতার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

২. আকাশবাণী (অল ইন্ডিয়া রেডিও - Prasar Bharati)

  • বর্তমান অবস্থা:

    • DRM (Digital Radio Mondiale): ভারত অনেক আগেই রেডিও ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। আকাশবাণী তাদের বিপুল সংখ্যক AM ট্রান্সমিটারকে DRM প্রযুক্তিতে রূপান্তর করেছে, যা ডিজিটাল সিগন্যালে স্ফটিক স্বচ্ছ শব্দ পৌঁছে দেয়।

    • NewsOnAIR অ্যাপ: আকাশবাণীর 'NewsOnAIR' অ্যাপের মাধ্যমে তাদের দেশি-বিদেশি শতাধিক লাইভ রেডিও স্টেশন কোটি কোটি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় শ্রোতা শুনছেন।

  • ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:

    • ভারতে গাড়ির আধুনিক ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেমে DRM রেডিও সুবিধা যুক্ত হওয়া এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের কারণে আকাশবাণী রাষ্ট্রীয় রেডিও হিসেবে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

রেডিওর সামগ্রিক ভবিষ্যৎ

ঐতিহ্যবাহী অ্যানালগ অ্যান্টেনা দিয়ে টিউন করে রেডিও শোনার দিন দ্রুত সংকুচিত হলেও "অডিও মাধ্যম" হিসেবে রেডিওর মৃত্যু ঘটছে না। এর রূপান্তর ঘটছে নতুন ৩টি ধারায়:

  1. ডিজিটাল ও স্মার্ট রেডিও: ইন্টারনেট চালিত রেডিও (Internet Radio), কার-ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম এবং স্মার্ট স্পিকারের (যেমন: Alexa, Google Home) মাধ্যমে রেডিও এখন ডিজিটালি শুনছেন শ্রোতারা।

  2. পডকাস্ট ও অন-ডিম্যান্ড ফরম্যাট: ফ্রিকোয়েন্সির নির্ধারিত সময়ের বাইরে গিয়ে শ্রোতা যখন খুশি তখন পছন্দের অডিও কনটেন্ট ও খবর শোনার দিকে ঝুঁকেছেন।

  3. জরুরি দুর্যোগকালীন মাধ্যম: ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ বা সেলুলার নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলেও অ্যানালগ বা ব্যাটারিচালিত রেডিও একমাত্র ব্যাকআপ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে বিশ্বে আজীবন টিকে থাকবে।