ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি চুয়াডাঙ্গার কিশোরি ফুটবলারদের স্বপ্ন

আকিমুল ইসলাম 
প্রতিভাবান কিশোরি ফুটবলার মারিয়ার যাতায়াত খরচ দিতে না পারায় বন্ধ হয়েছে ফুটবল খেলার অনুশীলন।  দিন মজুর পিতার পক্ষে প্রতিদিন খরচ বহন করা অসম্ভব হওয়ায় মেয়ের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ফিঁকে হচ্ছে। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুটবল অনুশীলনের জন্য বাবার ভ্যান গাড়িতে করে চুয়াডাঙ্গায় আসেন চাঁনমতি। আত্নবিশ্বাস আর চেষ্টার কাছে হার মেনেছে দারিদ্রতা। দারিদ্রতা তাদের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন থামাতে পারেনি কিন্তু সামর্থ থাকলেও সামাজিক বাধায় থমকে যাচ্ছে। ফুটবল একাডেমির বিথী, রুপালি, রুমানা সিনথিয়া, বিদিশা, রত্নাসহ সকল খেলোয়ার অস্বচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা।  উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে ফুটবলারদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

চুয়াডাঙ্গা  আলোকদিয়া গ্রামে দরিদ্র পরিবারে জন্ম মারিয়ার। সে রোমেলা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী।  বাবা নির্মাণ শ্রমিক ।প্রতিদিন কাজ না থাকলে পড়তে হয় আর্থিক সংকটে। গ্রাম থেকে চুয়াডাঙ্গায় অনুশীলনে আসতে ৫০-৬০ টাকা যাতায়াত খরচ লাগে। যাতায়াত খরচ বহন করতে না পারায় বন্ধ রয়েছে প্রতিভাবান এই কিশোরি ফুটবলারের অনুশীলন। মারিয়া বাদে গ্রামের অন্যরা ঠিকই আসছেন মাঠে।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম চাঁনমতির। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন করছে। প্রতি ভোরে বাবার সাথে ভ্যান গাড়িতে চড়ে চুয়াডাঙ্গার পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে ছুটে আসে। বাবা মেয়েকে নিতে আবার ছুটে আসেন। মামা দামুড়হুদা এলাকার একটি জৈব সার কারখানায় দিন মজুরের কাজ করেন। আলোকদিয়া হাতিকাটা গ্রামে ছোট্র একটি খুপড়ি ঘরে মা-বাবা, দাদি, ভাইয়ের সাথে থাকেন চাঁনমতি। পড়াশুনার পাশপাশি সেরা ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। জাতীয় দলের হয়ে দেশে ও বিদেশে খেলার স্বপ্ন দেখে দু চোখ জুড়ে।
চুয়াডাঙ্গার মহাতাব উদ্দিন ফুটবল একাডেমি গড়ে উঠেছে ২০২০ সালে। করোনা কালিন সময়ে ঘর বন্দি জীবন থেকে মেয়েদের মুক্ত করতে এ ব্যাতিক্রম উদ্যোগ নেন সাবেক ফুটবলার মিলন বিশ্বাস। ২৫ জন কিশোরি ফুটবলার নিয়ে একাডেমির যাত্রা শুরু হয়েছে। মেয়েদের ফুটবল খেলাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে চায় না পরিবার ও স্থানীয়রা। নানা প্রতিকূলতা মাড়িয়ে প্রতিদিন মাঠে আসছেন। যারা ফুটবল খেলতে পারতো না, এখন তারা ফুটবলকে আয়ত্তে নিতে পারছেন। তারা বল রিসিভ, সুট, কাটসহ সব কিছুই রপ্ত করে পরিণত ফুটবলার হচ্ছে। বুট পায়ে দিয়ে সহজে ছুটাছুটি করতে পারে। একাডেমি থেকে ফুটবলারদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। প্রতিদিন সকালে কিশোরিরা আড়াই থেকে তিন ঘন্টা একটানা অনুশীলন করেন।
খেলোয়ারদের চেহারায় ফুটে উঠে দারিদ্রতা। শতবাধা পেরিয়ে একাডেমির, বিথী, রুপালি, মানিয়াসহ সকলে ফুটবলার হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছেন। বেঁচে থাকার জন্য দু’বেলা অন্ন জোগাড় কষ্ট সাধ্য, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা। বেশির বাভ খেলোয়ারের পারিবারিক অবস্থা বেশ নাজুক। যা তাদের চেহারা ও পোশাকে ফুটে উঠে। ফুটবল অনুশীলনের পর তাদের যে খাবারের প্রয়োজন তা কখনো চোখে দেখে না। শারীরিক ফিটনেসের জন্য প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার। সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে এরা একদিন সেরা খেলোয়ার হতে পারবে। চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কিশোরি ফুটবলাররা আসেন।
কিশোরি ফুটবলার মানিয়া বলেন, ফুটবলা খেলা গ্রামের মানুষ ভাল চোখে দেখে না। তারা অনেক খারাপ কথা বলে। সে কারণে মা-বাবা ফুটবল খেলতে নিষেধ করেন। পরিবার থেকে বিয়ের কথা বলতো। কিন্তু আমি বিয়ে করতে চায়নি। পড়াশুনার পাশাপাশি ফুটবল খেলতে চায়।
চুয়াডাঙ্গার আলোকদিয়া মনিরামপুর গ্রামের মেয়ে মারিয়া জানান, বাবা রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। প্রতিদিন কাজ থাকে না। বাড়ি থেকে মাঠে আসতে ৫০টাকা মত লাগে। সে কারণে মা-বাবা নিষেধ করেছে ফুটবল খেলতে। আমার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও আর্থিক অভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অন্যদের মত ফিরতে চায় খেলার মাঠে। পরিবারে ইচ্ছা আছে আমি ভাল খেলোয়ার হয়।
 আলোকদিয়া হাতিকাটা গ্রামের মেয়ে চাঁনমতি বলেন, দরিদ্রতা আমাদের নিত্য সঙ্গী। বাবার ভ্যান গাড়িতে চড়ে মাঠে আসা যাওয়া করি। মা সংসারে হাল ধরতে কাজ করেন। ভাল পোশাক ও খাবার বাবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। স্বপ্ন দেখি লাল-সবুজের জার্সিতে গায়ে দেশের হয়ে খেলবো।
ফুটবলার মানিয়ার বাবা আব্দুল মাজিদ বলেন, গ্রামের অনেকে অনেক কথা বলে। তখন খারাপ লাগে। আমি চায় পড়াশুনা আর খেলাধুলা চালিয়ে যাক। কারও কথায় কান দিতে চায় না।

মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস ফুটবল একাডেমির পরিচালক মিলন বিশ্বাস জানান, অনেক স্বপ্ন নিয়ে একাডেমি করেছি। মেয়েদের খেলার মাঠে নিয়ে আসতে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে মেয়েরা নিয়মিত মাঠে না আসতে পারলে কষ্ট হয়। মেয়েরা অনেক ভাল ফুটবল খেলে। তাদের নিয়ে আমি আশাবাদী। সহযোগিতা পেলে নারী ফুটবল এগিয়ে নিতে পারতাম। একাডেমিতে অনেক ভাল খেলোয়ার আছে। যারা ঢাকায় খেলতে পারবে।

 নারী ফুটবল একাডেমি প্রধান উপদেষ্টা মাহাবুবুল ইসলাম সেলিম বলেন, চুয়াডাঙ্গায় প্রথম নারী ফুটবল একাডেমি এটি। মেয়েদের মাঠে নিয়ে আসাটা প্রথম দিকে চ্যালেঞ্জ ছিল। একাডেমির অনেক মেয়ে দরিদ্র পরিবারের। তাদের জন্য প্রয়োজন পৃষ্ঠপোশকতা। একাডেমিতে ভাল ফুটবলার রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, স্কুলে পড়া কিশোরি মেয়েদের নিয়ে ফুটবল একাডেমি গড়ে উঠেছে। পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠটি মেয়েদের খেলার জন্য উপযোগি করা হয়েছে। তাদের আমরা ফুটবল, বুট, হুজ, জার্সিসহ প্রয়োজণীয় উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করছি। এখান থেকে খেলোয়ার বাছাই করে জেলার জন্য একটি ভাল দল গঠন করতে চায়।
প্রবাহঅনলাইনডটকম

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত রিপোর্ট
;