এম আব্দুর রাজ্জাক, বগুড়া থেকে :
নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার এক ছোট্ট গ্রাম চকশ্রীপুর । এখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাজনীন নাহার শিমুর। সাধারণ পরিবারের মেয়ে হয়েও ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল আলাদা—নিজেকে প্রমাণ করা, নিজের কণ্ঠ আর মেধা দিয়ে আলোকিত করা চারপাশকে।
পড়াশোনায় দৃঢ় প্রত্যয়
চকশ্রীপুর এ.এম. হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পেরিয়ে ব্যবসায় শিক্ষায় উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়েও তিনি থেমে থাকেননি। বরং একাডেমিক যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে থেকেছেন দৃঢ় পদক্ষেপে।
রেডিও থেকে শুরু ক্যারিয়ার
২০১৩ সালে এক কমিউনিটি রেডিওতে উপস্থাপক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন শিমু। তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি, এই যাত্রাই তাকে এনে দেবে দেশব্যাপী স্বীকৃতি। ধীরে ধীরে তিনি নিউজ প্রেজেন্টার, প্রোগ্রাম প্রডিউসার ও প্রজেক্ট প্রডিউসার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তার প্রাণবন্ত কণ্ঠ আর সাবলীল উপস্থাপনা দর্শক–শ্রোতার মন জয় করে নেয় দ্রুত।
পুরস্কারে সাফল্যের স্বীকৃতি
কাজের স্বীকৃতি এসেছে একের পর এক পুরস্কারে।
Best Mentor Award 2015 (Borendro Radio)
Best Program Producer Award 2016 (EC Bangladesh)
Right to Information Award 2017 (BNNRC)
Community Thekathon Award 2018 (USAID)
Best Presentation Award 2019 (Sangeeta Music College, Kolkata)
Best Presenter Award 2020 (Nazrul Academy, Dhaka)
এই অর্জনগুলো শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং প্রমাণ করে—একজন গ্রামের মেয়েও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারে।
পরিচিত ভয়েজ আর্টিস্ট
বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেল ও মিডিয়ায় তার কণ্ঠস্বর প্রতিনিয়ত শোনা যায়। সংবাদ পাঠ, বিজ্ঞাপন, ডকুমেন্টারি কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সবকিছুতেই তার ভয়েজ হয়ে উঠেছে পরিচিত নাম। অনেকে বলেন, “নাজনীন নাহার শিমুর কণ্ঠস্বরের ভেতর এক ধরনের শক্তি আছে, যা শ্রোতাকে আকৃষ্ট করে রাখে।”
প্রশিক্ষক ও কো-অর্ডিনেটর
বর্তমানে তিনি নওগাঁর টেগাস আইটি লিমিটেডে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি সাইফুর’স স্পোকেন ইংলিশ কোচিং সেন্টারে কো-অর্ডিনেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তোলার পেছনে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা শুধু ইংরেজি শেখে না, বরং জীবনে সফল হওয়ার অনুপ্রেরণাও খুঁজে পায়।
সমাজ ও সংস্কৃতির সেবায়
শুধু পেশাগত জীবনে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন নাজনীন নাহার শিমু। নারী উন্নয়ন, শিশু অধিকার, সমাজ পরিবর্তন ও সংস্কৃতি চর্চায় তিনি কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। বিভিন্ন কর্মশালা, নাটক, প্রশিক্ষণ ও প্রচারণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
অনুপ্রেরণার প্রতীক
অনেকে তাকে বলেন “গ্রামের মেয়ে হয়েও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এক বিরল উদাহরণ।”
তিনি নিজেই বলেন—
“আমি চাই প্রতিটি তরুণী নিজের স্বপ্নকে বিশ্বাস করুক। আমি গ্রাম থেকে উঠে এসেছি, আজ দেশ–বিদেশে কাজ করছি। স্বপ্ন আর পরিশ্রম থাকলে অসম্ভব কিছুই নয়।”
শেষকথা
আজকের প্রজন্ম যখন নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর, তখন নাজনীন নাহার শিমুর জীবনকথা হয়ে উঠেছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তার পথচলা প্রমাণ করে—পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর মেধা থাকলে কোনো বাধাই আপনাকে আটকাতে পারবে না।