ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

দেড় হাজার কোটি ডলারের দ্বন্দ্বে ছন্নছাড়া হিন্দুজা পরিবার

‘সবকিছুই সবার এবং কোনো কিছুই কারো একার নয়।’ ২০১৪ সালে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে চার হিন্দুজা সহোদর স্বাক্ষর করে এ নীতিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। হিন্দুজাদের বলা হয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের অন্যতম ধনী পরিবার। বাইরের বিশ্বের কাছে ধনকুবের চার হিন্দুজা ভাই শ্রীচাঁদ, গোপীচাঁদ, প্রকাশ ও অশোকের যূথবদ্ধতা সবসময়ই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিন তাদের এ সম্পর্কে আঁচড় পর্যন্ত পড়েনি। কারণ তারা সম্মিলিত ব্যবসায়িক দর্শনকে সমর্থন করতেন। মুম্বাই, লন্ডন ও জেনেভার বাড়িতে যৌথ পরিবার হিসেবে দীর্ঘদিন নির্বিবাদে বাস করেছেন।

দ্বন্দ্বের শুরু হয় ২০২০ সালের জুনে। যুক্তরাজ্যের একটি আদালতে সুইজারল্যান্ডে হিন্দুজা ব্যাংকের একক মালিকানা দাবি করে বসেন বড় ভাই শ্রীচাঁদ। পাশাপাশি বাকি তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে বলেন, আগে যে চুক্তি হয়েছে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দুজা পরিবারের অন্য সদস্যরা অবশ্য বলেছিলেন, ৮৫ বছর বয়সী শ্রীচাঁদ পরমানন্দ হিন্দুজা, যিনি এসপি নামে পরিচিতি, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত। তার এ রোগের পর থেকেই শ্রীচাঁদের সবকিছু দেখাশোনা করছেন তার মেয়ে ভিনু। এ সময় মেয়েকে পাওয়ার অব অ্যার্টনি দেন শ্রীচাঁদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে গোপীচাঁদ তার বড় ভাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন। তার দাবি ছিল, মেয়েকে ক্ষমতা দেয়ার সিদ্ধান্ত বিতর্কিত। কারণ শ্রীচাঁদ সুস্থ অবস্থায় নেই, ডিমেনশিয়া রোগের সময় এমনটা করেছেন। এরপর শ্রীচাঁদের দুই মেয়ে ভিনু ও শানু তার হয়ে এ আইনি লড়াই চালান। প্রকৃতপক্ষে শানুর ছেলে করমই মামলা লড়েছেন বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়।

ব্যাংক, গ্যাস, তেল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিদ্যুৎসহ প্রায় ৩৮টি ক্ষেত্রে ব্যবসা ছড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম ধনী এ পরিবারের। তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। প্রায় ৪০টি দেশে ছড়িয়ে থাকা হিন্দুজা পরিবারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি কর্মী। ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি হিন্দুজা পরিবারের মালিকানাধীন। এছাড়া বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ বাস প্রস্তুতকারী কোম্পানির মালিকও তারা। শ্রীচাঁদের অসুস্থতার জের ধরেই ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পরিবারটি।

আইনি লড়াই চলার সময় শ্রীচাঁদের কন্যা ভিনু জোর দিয়ে বলেছিলেন যে চাচারা পরিবারের পক্ষ থেকে তার অংশ কাটতে চান, তার বাবার সম্পদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা ছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। এ প্রসঙ্গে গোপীচাঁদ অবশ্য বলেন, আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে কখনই কোনো ঝগড়া হয়নি। এসপি একসময় আমাকে বলেছিলেন, যদি আমার মৃত্যু হয় তাহলে তুমি আমার কন্যাদের নিজের মেয়ের মতো করেই দেখো।

কিন্তু ভিনু ঠিক উল্টোটা অভিযোগ করে বলেন, ২০১৪ সাল থেকে তার পরিবারের সদস্যদের হিন্দুজা পরিবারের সামগ্রিক আয় থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় ২০১৮ সালে তাদের হাত শূন্য হয়ে যায় তাই তার কাছে মামলা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবে ২০২১ সালের ভিনু ও তার বোন শানু হিন্দুজা বিচারকের কাছে স্বীকার করেন যে তারা এসপির তহবিল তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। এরপর তাদের পক্ষের আইনজীবীও মামলা থেকে সরে আসেন।

হিন্দুজা ভাইদের এ যুদ্ধ শেষ হয় জুনে। তখন গোপীচাঁদের আইনজীবী জানিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা চুক্তিতে যেতে সম্মত হয়েছেন। সম্প্রতি সে রায় প্রকাশ্যে এসেছে। লন্ডনের আপিল আদালতের রায় অনুসারে, পারিবারিক সম্পদ নিয়ে ইংল্যান্ডের হাইকোর্টে আইনি বিবাদে আটকে থাকা হিন্দুজা ভাইরা একটি গোপনীয় চুক্তিতে পৌঁছেছেন। গত ১ জুলাই থেকে এ প্রক্রিয়াগুলোয় একটি সম্মতি আদেশ দাখিল করা হয়।

এদিকে বিচারক বলেন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ধরে রাখতে শ্রীচাঁদের দুই কন্যার স্বার্থের দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্য। তাছাড়া গোপীচাঁদের আইনজীবীদের মতে, ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে শ্রীচাঁদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ২৬ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, যার মধ্যে ছিল আইনি ফি এবং তার নাতি-নাতনিদের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল।

হিন্দুজা পরিবারটি যদিও একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ডেকেছে। কিন্তু তাদের বিদ্বেষপূর্ণ দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ভবিষ্যেক ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

এদিকে ব্রিটেনের কোর্ট অব প্রটেকশনের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হেইডেন নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যথেষ্ট সুযোগ ও আর্থিক সামর্থ্য থাকার পরও পরিবার শ্রীচাঁদকে সঠিক যত্নের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণেই তাকে একটি সরকারি নার্সিং হোমে ভর্তি করার নির্দেশ দেয়া হলো। তবে তার স্বাস্থ্য ও কল্যাণের বিবেচনার কথা বলে হিন্দুজা পরিবার বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে নেবে বলে জানানো হয়।

সূত্র: এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস ও স্কাই নিউজ

;