ই-পেপার | শনিবার , ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

রেলের বড় বিনিয়োগের প্রকল্পগুলো কি আয় বাড়াতে পারবে?

প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঢাকা-ভাঙ্গা অংশে বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল শুরু হচ্ছে ১ নভেম্বর। শুরুর দিকে এ রুটে চলবে দুটি ট্রেন—সুন্দরবন ও বেনাপোল এক্সপ্রেস। ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-যশোরের মধ্যে চলাচল করা এ ট্রেন দুটিকে বঙ্গবন্ধু সেতু রুট থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে পদ্মা সেতু রুটে। তবে এ পথে ভ্রমণ সময় কিছুটা কমলেও যাত্রী পরিবহন করে ট্রেন দুটির আয় বাড়বে না। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বাড়াতে আপাতত কোনো ভূমিকা রাখছে না এ রেলপথ।

রেলের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দৈনন্দিন ট্রেন পরিচালনায় ২০০৯ সালের পর থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে চলমান রয়েছে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্প, যেগুলোর সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়িত ও চলমান প্রকল্পগুলোর সিংহভাগ করা হচ্ছে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণে।

বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে গত ১৪ বছরে রেলের রাজস্ব বেড়েছে সামান্যই। যাত্রী ও মালপত্র পরিবহন করে ২০০৯-১০ অর্থবছর বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় ছিল ৫৬৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রেলের বার্ষিক আয় দাঁড়িয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো (২০২০-২১ অর্থবছরে আয় ১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা)। বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২৭ সাল নাগাদ আয় বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায় (২৮৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার) উন্নীত হতে পারে। আয় বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেলের পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে আয় বাড়লেও লোকসান কমেনি, উল্টো বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা।

পর্যায়ক্রমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলোকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা হচ্ছে। নতুন রেলপথ ও সেতু নির্মাণ, পুরনো রেলপথসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সংস্কার করা হচ্ছে। সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। চলমান কয়েকটি প্রকল্প শেষ হলেই অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করবে
—নূরুল ইসলাম সুজন, রেলপথমন্ত্রী
এ সময়ে শুধু লোকসানই বাড়েনি, ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা, যাত্রীসেবার মানসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোয়ও উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। এর বিপরীতে বিদ্যমান নেটওয়ার্কে থাকা একটি বড় অংশের রেলপথ ও সেতু সংস্কারের অভাবে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা নেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে। রেলের অধিকাংশ ইঞ্জিন-কোচের আয়ুষ্কালও ফুরিয়ে গেছে। জনবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে অনেক স্টেশন।

অন্যদিকে চলমান বিনিয়োগের বেশির ভাগই হচ্ছে কয়েকটি বড় প্রকল্পে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পেই খরচ হচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে হচ্ছে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণে খরচ হচ্ছে ১৭ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এছাড়া খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এসব বড় প্রকল্প রেলের আয় বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি রেললাইন করা হলো সমান্তরালভাবে। দুটো প্রকল্পই বিদেশী ঋণের। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়ার সময় আমাদের আরো বেশি সচেতন হওয়া দরকার ছিল। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে আমাদের একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন ওই পথকে আরো বাধাহীন করা দরকার ছিল ভাঙ্গা থেকে। কিন্তু এখন রেললাইন হওয়ার কারণে একটি আরেকটির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। সেক্ষেত্রে এ প্রকল্পগুলো নেয়ার আগে সম্ভাবতা যাচাই আরো সঠিকভাবে করার দরকার ছিল। কারণ অর্থনৈতিক রিটার্নের একটা শঙ্কা কিন্তু এখন রয়ে গেছে। বর্তমানে যে নেটওয়ার্ক রয়েছে সেখানে তো রিটার্ন কম। লোকসানে রয়েছে। প্রতি বছর একটি বড় অংকের লোকসান থাকে। সড়ক ও রেলপথ সম্প্রসারণের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি। কারণ রেলপথ শুধু অবকাঠামোনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়। এটাকে প্রতিনিয়ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এর জন্য আবার আলাদা বিনিয়োগও করতে হয়। পদ্মায় সড়কের পাশাপাশি রেললাইন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে বলে আমি মনে করি না।’

বর্তমানে রেলের যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেটাই লাভজনক নয়। ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। তার মানে আগের বিনিয়োগগুলোর সুফল সেভাবে পাওয়া যায়নি। চলমান বড় প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক রিটার্ন নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। বড় প্রকল্পগুলো নেয়ার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই আরো সঠিকভাবে করার দরকার ছিল
—ড. হাদিউজ্জামান, অধ্যাপক, বুয়েট

চলমান অন্য বড় প্রকল্পগুলো নিয়েও একই ধরনের শঙ্কার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিনিয়োগে ভুল পথ অনুসরণ করছে রেলওয়ে। সবকিছুর আগে দরকার বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ক সংস্কার, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন কোচ সংগ্রহ, ট্রেন পরিচালনায় বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু করা, সিগন্যাল ও পরিচালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। এসব বাদ দিয়ে সংস্থাটি এমন সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যেগুলোর অর্থনৈতিক উপযোগিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাস্তবায়ন হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, রেলের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় বাড়াতে প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এমন বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর একটি কাশিয়ানি-টুঙ্গিপাড়া রেলপথ। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থেকে টু্ঙ্গিপাড়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন একটি ব্রড গেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ ২০১৮ সালে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। একই প্রকল্পের মাধ্যমে কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া অংশে আরো ৮২ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন করা হয়। ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ রেলপথটিতে বর্তমানে ট্রেন চলছে দিনে একটি। টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি চলাচল করছে গোপালগঞ্জের গোবরা পর্যন্ত। ট্রেনটি পরিচালনার জন্য কালুখালী থেকে গোবরা পর্যন্ত ১১টি স্টেশনে প্রয়োজনীয় জনবল নিযুক্ত করতে হয়েছে রেলওয়েকে। পাশাপাশি ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলপথ, সিগন্যাল ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও করতে হচ্ছে। বিনিয়োগের বিপরীতে রেলপথটি থেকে রাজস্ব আসছে সামান্য।

একই অবস্থা ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর রেলপথের। ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা খরচ করে নির্মাণ করা রেলপথটির কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালে। ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি চালুর পর থেকে ঢালারচর এক্সপ্রেস নামের একটি মাত্র ট্রেন চলাচল করছে।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ আগামী ১২ নভেম্বর উদ্বোধন হবে। এ রেলপথটির নির্মাণ ব্যয় ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ রেলপথটিও রাজস্ব আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে প্রকল্প চলমান রয়েছে ২৫টি। এসব প্রকল্পের জন্য সব মিলিয়ে খরচ হচ্ছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা বিদেশী ঋণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলের উন্নয়নে ৮৯টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ৮৭৩ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ, ৩৪০ কিলোমিটার রেলপথকে মিটার গেজ থেকে ডুয়াল গেজে রূপান্তর, ১ হাজার ৩৯১ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন/পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এসবের স্টেশন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার, ইঞ্জিন-কোচ সংগ্রহ, সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও এ সময়ে ট্রেন পরিচালনায় খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর সুফল নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুতই এসব প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করবে বলে মন্তব্য করেছেন রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা পর্যায়ক্রমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলোকে ডাবল লাইনে উন্নীত করছি। পুরনো সেতুর বদলে নতুন সেতু করছি। পুরনো রেলপথ সংস্কার, প্রয়োজন হলে পুনরায় নির্মাণ করছি। সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করছি। একই সঙ্গে আমরা চাই, দেশের সব জেলায় রেলের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে। আমাদের এ উদ্যোগগুলো আপাতত রেলের রাজস্ব আয় বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা হয়তো রাখতে পারছে না, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে এ চিত্র বদলে যাবে।’

চলমান কয়েকটি প্রকল্প শেষ হলেই অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করবে বলেও দাবি করেন তিনি।

বনিকবার্তা

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত রিপোর্ট
;