ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

মনজু ভাই ও মন্টু ভাই এর গল্প,সাংবাদিকতার দুই স্তম্ভ -মনজুর আহমদ ও কাজী মন্টু

আকবর হায়দার কিরন

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস যদি কখনো কোন জীবন্ত গ্রন্থে রূপ পায়, তবে তার দুই অনন্য অধ্যায়ের নাম নিঃসন্দেহে হবেন মনজুর আহমদ এবং কাজী মন্টু। তারা শুধু পেশাদার সাংবাদিক নন, ছিলেন ঘটনাবহুল সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী, এবং আজও প্রবাসে বসে সেই ইতিহাসের ধারাবাহিক ব্যাখ্যাকার।

মনজুর আহমদ: সংবাদ-যুদ্ধের নির্ভীক যোদ্ধা

মনজুর আহমদ ভাইয়ের সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৬০ সালে, দৈনিক সংবাদ-এ যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন সাংবাদিকতা মহলের অন্যতম স্তম্ভ—দৈনিক বাংলা পত্রিকার চীফ রিপোর্টার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-এর বহু বছরের নেতৃত্বের কর্ণধার।

তাঁর রিপোর্টিং মানেই ছিল এক ঐতিহাসিক দলিল। ষাট ও সত্তরের দশকের রাজনৈতিক সংঘাত, ৭০ সালের নির্বাচন, ২৫ মার্চের ভয়াল রাত, এমনকি ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ—সব কিছুর সাথেই তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় মুহূর্ত—জিয়াউর রহমানের প্রথম সাক্ষাৎকার, তা-ও নিয়েছেন তিনিই, দৈনিক বাংলার পক্ষ থেকে।

তিনি সাংবাদিক প্রতিনিধিদল নিয়ে সফর করেছেন বিশ্বের নানা দেশে। সংবাদ আর সংবেদনার মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন এমন এক স্তম্ভ হিসেবে, যার ছায়া আজও অনেক নবীন সাংবাদিকের মাথার উপর।

আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে আশির দশকের শেষ দিকে। প্রবাসে এসে নিউ ইয়র্কের জামাইকার তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম পরম শ্রদ্ধেয় বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী ভাইকে নিয়ে। সেই স্মৃতি আজও মনকে আলো করে।

কাজী মন্টু: সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার সমান্তরাল পথে

কাজী মন্টু ভাইর শুরু সাংবাদিকতায় সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায়, উত্তাল সত্তরের দশকে। এরপর একে একে যুক্ত হন নিউ নেশন, মর্নিং সান, ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। দীর্ঘদিন ছিলেন দুবাইয়ের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক খালিজ টাইমস-এর প্রতিনিধি। তাঁর কলম ছিলো অনুসন্ধানী, স্পষ্ট এবং দায়িত্বশীল।

তিনি একাধিকবার সরকারি আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন, পেশাগত দায়িত্বে। নব্বইয়ের দশকে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন নিউ ইয়র্ক সিটিতে। পেশাদার সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিজেকে নিয়োজিত করেন জনসেবায়। বহু মানুষ তাঁর মাধ্যমে এই দেশে ইমিগ্র‍্যান্ট হয়েছেন—নির্বাক কৃতজ্ঞতায় ভরা এক মানবিক অধ্যায়, যেটি কেবল মানুষ গড়ার কারিগররাই রচনা করতে পারেন।

আমি তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি ভয়েস অব আমেরিকা, কিরন টিভি, কফি উইথ কিরন-এর মতো বিভিন্ন মাধ্যমে। তাঁর প্রতিটি কথায় ছিলো বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা ও সৌজন্যতার মেলবন্ধন।

কাজী মন্টু ভাইয়ের অফিসে গেলেই এক অন্য জগতে হারিয়ে যাই—বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সেই হাতেগোনা দিনের স্মৃতিতে। তখন বিদেশি দূতাবাস থেকে আমন্ত্রণপত্র আসত আমাদের কাছেই। কূটনৈতিক পার্টিতে গিয়ে অনেক প্রবীণ সাংবাদিককে দেখতাম একটু বেশিই পান করে ফেলেছেন, এবং বেসামাল হয়ে পড়েছেন। এসব হাস্যরস আর স্মৃতিরা আজ ইতিহাস হয়ে উঠেছে।

তাঁর অফিস ছিলো এক জীবন্ত আড্ডার কেন্দ্র। আমি দেখেছি সেখানে বসে আছেন কিংবদন্তি সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ খান মিন্টু ভাই, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, মিনার মাহমুদ, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ মোহাদ্দেস, শ্যামল দত্ত—প্রত্যেকেই নিজেদের সময়ের ইতিহাসপ্রসূ সাংবাদিক।

একজন ইতিহাস, অন্যজন আলোকবর্তিকা

মনজুর আহমদ ভাই যেন এক জীবন্ত নথি, আর কাজী মন্টু ভাই এক জীবন্ত সংযোগ—বর্তমান ও অতীতের মধ্যে সেতুবন্ধন করে থাকা এক অনন্য সত্তা। দু’জনের জীবনগল্পই সাংবাদিকতা নামক মহান পেশার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে থাকবে।

আজ তাঁরা নিউ ইয়র্কে প্রবাসী, হয়তো পূর্ণ সময়ের সাংবাদিকতায় নেই, কিন্তু তাঁদের কথা, অভিজ্ঞতা ও আড্ডা আজও আমাদের চোখ খুলে দেয়, শিক্ষা দেয়, এবং অতীতকে নতুন আলোয় চিনতে শেখায়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত রিপোর্ট
;