ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

ডুমুরিয়ায় বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ৪ কিলোমিটার তালবীজ রোপণ কর্মসূচি সোনামুখ স্মার্ট একাডেমি

সেলিম আবেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর বাজার থেকে রঘুনাথপুর বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ চার কিলোমিটার সড়কজুড়ে সম্প্রতি এক ব্যতিক্রমী সবুজায়ন কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। সোনামুখ স্মার্ট একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে রাস্তার দুই পাশে তালবীজ রোপণ করেন। মূলত ক্রমবর্ধমান বজ্রপাতের হার হ্রাস করা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে এটি একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ, যা শুধুমাত্র বনায়ন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এ এম কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এই কার্যক্রমে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন, যা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরির একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। তালবীজ রোপণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানান, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়া পরিস্থিতির যে দ্রুত অবনতি ঘটছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ জনপদে। বিশেষ করে বজ্রপাত এখন এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা থেকে বাঁচতে তালগাছ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, আগে গ্রামীণ রাস্তায় প্রচুর তালগাছ থাকলেও বর্তমানে তা বিলুপ্তির পথে, যার ফলে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। সোনামুখ স্মার্ট একাডেমির পরিচালক হূসেইন আহমেদ বলেন, শুধু বীজ রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং রোপণকৃত বীজ থেকে চারাগাছ বড় হওয়া পর্যন্ত তার সঠিক পরিচর্যা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বৃক্ষরোপণ পদ্ধতি শেখানোর মাধ্যমে তাদের কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবমুখী ও পরিবেশবান্ধব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে এখানে। রোপণকৃত তালবীজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন সংশ্লিষ্টরা, যাতে ভবিষ্যতে এই সবুজ বেষ্টনী দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আয়োজকরা জানিয়েছেন, ডুমুরিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়কগুলোতে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এই মডেলটি একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। সোনামুখ স্মার্ট একাডেমির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ‘আদর্শ শিক্ষা, মানবিক দীক্ষা’—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করেই তারা শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় পরিবেশবিদ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে, কারণ পরিকল্পিত বনায়ন ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানো অসম্ভব। তবে কেবল বেসরকারি উদ্যোগে নয়, বরং সরকারি পর্যায়েও যদি সড়কের দুই পাশে তালগাছ রোপণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তবেই বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। যথাযথ নজরদারি ও নিয়মিত পরিচর্যার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আয়োজকরা এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ডুমুরিয়ায় সোনামুখ স্মার্ট একাডেমির এই তালবীজ রোপণ অভিযান কেবলমাত্র একটি প্রতীকী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি টেকসই পরিবেশগত পরিবর্তনের সূচনা। চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই সবুজায়নের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে তা স্থানীয় বাস্তুসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বজ্রপাতজনিত প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে। এই ধরনের উদ্যোগ যদি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তা বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো ও পরিবেশ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করবে। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথ সুগম করার পাশাপাশি প্রকৃতিকে তার আপন মহিমায় ফিরিয়ে আনার এই লড়াই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

;