ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

মন্ত্রিসভার নির্দেশনা, সংকটের বছর হতে পারে ২০২৩

২০২৩ সালকে সম্ভাব্য সংকটের বছর ধরে নিয়ে ছয় নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ২০২১-২২ অর্থবছরের কার্যাবলি সম্পর্কিত বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় এসব বিষয়ে আলোচনা শেষে কয়েকটি নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে আগামী বছর সংকটের বছর হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি জানান, উৎপাদন বাড়ানো, বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠানো, রেমিট্যান্স বাড়ানো, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো, খাদ্য মজুদ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রাখার বিষয়ে মন্ত্রিসভা নির্দেশনা দিয়েছে।

বৈঠকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশের সংকট এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান সচিব। তিনি বলেন, বিশ্বের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, তিনটি কারণে ২০২৩ খুবই সংকটের বছর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর একটা কারণ হলো ফেডারেল রিজার্ভ রেট অব ইন্টারেস্ট বৃদ্ধি করে দিয়েছে। আরেকটি কারণ হলো কভিড মহামারী পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার হওয়ার আগেই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ফলে যে উন্নতি হচ্ছিল সেটা আবার ঋণাত্মক হয়ে গিয়েছে। তৃতীয় কারণটি হলো, চীন উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন কম করছে। যেটা বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করছে। এ তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণগুলোতে বলা হচ্ছে যে ২০২৩ একটি সংকটের বছর হওয়ার আশঙ্কা আছে। সবাইকে সে অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে হবে।

বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর মন্ত্রিসভায় বিস্তারিত আলোচনা হয় জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভার সদস্যরা ও প্রধানমন্ত্রী যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সেটি হলো, যেকোনো পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। যতই খাদ্য আমদানির কথা বলা হোক না কেন সংকট থাকবেই। যদিও ইউক্রেন ও রাশিয়াকে ফ্রি করে দেয়া হয়েছে যে খাদ্যের ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে না। কিন্তু এর পরও এ দুটি দেশের পরিস্থিতি এখনো প্রভাব রাখছে। ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে যেসব দেশ ঋণ নিয়ে কাজ করে বা যাদের আমদানি বেশি, তাদের দুদিক থেকে অসুবিধা হচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে অনুপাতে কম পণ্য পাচ্ছি। এজন্য এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে।

সচিব বলেন, এসব সংকট মোকাবেলায় বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর জোর দিয়েছে মন্ত্রিসভা। দক্ষ শ্রমিকরা বিদেশে গেলে অনেক বেশি বেতনে কাজ করতে পারবেন। যেসব দেশে শ্রমিক পাঠানো হবে, সেসব দেশের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াতে হবে, তারা যেন সঠিক প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট পায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তা না হলে তাদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের কোনো দাম থাকবে না।

রেমিট্যান্স বাড়াতে মন্ত্রিসভা কিছু নির্দেশনা দিয়েছে জানিয়ে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সম্ভবত বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করেছে যে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে এখন আর কাউকে ফি দিতে হবে না। যে ব্যাংকে পাঠাবে সেই ব্যাংকই এটা নির্ধারণ করবে যে যারা পাঠাবে তাদের কীভাবে সুবিধা দেয়া যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো ক্লিয়ার করেছে বা করবে। এছাড়া সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে। এজন্য বিনিয়োগের শর্ত আরো শিথিল করা যায় কিনা সে বিষয়ে কাজ চলছে। যাতে বিনিয়োগকারী শুধু বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কাছেই যাবে। সেখানেই তিন-চারটা উইন্ডো থাকবে, যেন সেখান থেকেই কাজ শেষ হয়ে যায়। সিটি করপোরেশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) যেন আলাদা করে যেতে না হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তো বলেই দিয়েছে ৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তাদের কাছে যেতে হবে না। এটা ভালো একটা উদ্যোগ। বিডাই এর অনুমোদন দিতে পারবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরো বলেন, খাদ্য মজুদকে সবসময় সন্তোষজনক অবস্থায় রাখতে হবে। এখন আমাদের মজুদ সন্তোষজনক। বেসরকারি খাতকেও ১৫ লাখ টন খাদ্য আমদানির জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বড় বড় দেশ যারা বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টারি ফুড যেমন তেল বা মসলা রফতানি করে তাদের সঙ্গে সরাসরি আমদানিকারকদের যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে তৃতীয় পক্ষ ছাড়া সরাসরি আমদানি করা যায় কিনা, সেই বিষয়ে বলা হয়েছে। সরাসরি গেলে কম দামে পাওয়া যাবে, যা আমাদের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বৈঠকে ট্যাক্স কমফোর্টের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আমাদের খাদ্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আলোচনা করেছেন যে উৎসে করসংক্রান্ত কিছু বিষয় আছে, এগুলো দিতে হয়। এ বিষয়ে এনবিআরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে শিগগিরই যেন সন্তোষজনক ও কমফোর্টেবল একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে চলে যায়। যারা খাদ্য আমদানি করে তারা যাতে একটা সুবিধাজনক জায়গায় আসতে পারে।

এ সময় ব্যক্তিগত জমি চাষ না করলে তা খাস হয়ে যাওয়ার প্রচারণাকে গুজব বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, কারো জমি চাষ করল না আর আমি খাস করব, এ রকম কোনো পদ্ধতি নেই। খাস করার একটা আলাদা পদ্ধতি রয়েছে। সেটা অনেক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। কোনো জমি খাস করার দরকার হলে তাকে নোটিস দিতে হবে, তার কাছে শুনতে হবে। এটা একটা গুজব চারদিকে ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যদি দুই-এক জায়গায় কোথাও কেউ করেও থাকে তাহলে এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়ে দেয়া হয়েছে, কেউ যাতে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা না নেয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কেউ কয়েক বছর চাষ না করলে সেটি খাস হয়ে যাবে, এমন কোনো আইন বা নিয়ম নেই, এটা একটা গুজব

খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে একটা বোর্ড (বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড) গঠন করছে সরকার। এজন্য ‘বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০২২’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, গরু ও ছাগলের দুধ ব্যবস্থাপনার জন্য মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ আইন নিয়ে এসেছে। মিল্কভিটা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেটি সুনির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায়। এ আইনটি পুরো বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য। এ আইনের অধীনে একটি বোর্ড থাকবে, সেই বোর্ডে চেয়ারম্যান ও তার সঙ্গে সদস্যরা থাকবেন। তারা দুগ্ধজাত খাবারের মান ও গুণাগুণের বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। বিএসটিআই বিভিন্ন পণ্যের মানের বিষয়টি নিশ্চিত করে। কিন্তু দুগ্ধজাত খাবারের মানের বিষয়টি নিশ্চিত করবে ডেইরি উন্নয়ন বোর্ড। এটা বিএসটিআইয়ের অধীনে যাবে না। এ আইন কার্যকর করা হলে খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য হিসেবে সরবরাহ নিশ্চিত করারও সুযোগ থাকবে।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে জাপানের সঙ্গে শুল্ক বিষয়ে চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সঙ্গে এ চুক্তি সই হতে পারে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘এগ্রিমেন্ট অন কো-অপারেশন অ্যান্ড মিউচুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন কাস্টমস ম্যাটারস’-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরো বলেন, কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক, বিশেষ এবং অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীরা যেন অন-অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যায় সেই বিষয়ে একটি চুক্তি সই হয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্যাটাগরির পাসপোর্টধারীরা বিনা পাসপোর্টে দুদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। এতে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনীতি, বাণিজ্য সহায়তা সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া শতভাগ হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশন বাংলাদেশের বিমানবন্দরে করতে সৌদি আরবের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তির খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তির খসড়াও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সচিব জানান, গত বছর হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশন এখানে হয়েছে। এবার চুক্তি হয়েছে এখন থেকে আমাদের হজযাত্রীদের ইমিগ্রেশন আমাদের এখানেই হবে।

;