ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

ত্রয়োদশ বিশ্ব বেতার দিবসের ভাবনা

প্রদীপ চন্দ্র কুন্ডু

সারা বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আজ পালিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ বিশ্ব বেতার দিবস। ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর ১৩ জানুয়ারী এই দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের অনুমোদনক্রমে ইউনেস্কো এই দিবস পালন করার উদ্যোগ নেয়। বেতার বা রেডিওর গুরুত্ব বিষয়ে আমরা প্রায় সবাই অবহিত। রেডিও আমাদের বিনোদন, শিক্ষা ও তথ্য প্রদানের এক অনন্য মাধ্যম।
বয়সে একশ বছরের কিছুটা বেশি হলেও, এই মাধ্যমটি নিঃসন্দেহে তথ্য বিনিময়, সামাজিক আদানপ্রদান, তথা জনশিক্ষার প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে আজও গোটা বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। বিশেষ করে স্পর্শকাতর মহিলা ও যুব সম্প্রদায় সমেত সমাজের সকল স্তরের মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ নিয়ে বেতার প্রতিনিয়ত চিন্তা করে ও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করে। বিপর্যয়ের সময় – তা সে প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট যেমনই হোক না কেন, জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে বেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। এছাড়া বেতার সাংবাদিকদের জনগণের কাছে সঠিক তথ্য জানানোর এবং তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার উপযুক্ত সুযোগ প্রদান করে।
বিগত বছরগুলোর মতো, ইউনেস্কো এবার ও বিশ্ব বেতার দিবসের জন্য একটি বিশেষ থিম বা মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ বছরের বিশ্ব বেতার দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি হলো – Radio : A Century Informing, Entertaining and Educating । এই বিশেষ থিম যথাযথভাবে বেতারের সোনালী অতীত, সুন্দর বর্তমান এবং প্রতিশ্রুতিপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতি ইঙ্গিত করে। একশ বছরের সুদীর্ঘ পথ চলায় রেডিও যে সমগ্র বিশ্ববাসীকে তথ্য প্রদান, জ্ঞান দান ও মনোরঞ্জন করার কাজগুলি সুচারুভাবে সম্পন্ন করে এসেছে তাকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। অবশ্যই এতে কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই।
কিন্তু, আমরা যদি কিছুটা বাস্তবানুগ হই, বিশ্বব্যাপী চিরাচরিত রেডিও পরিষেবার বর্তমান অবস্থাটা নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে মনে হয় বেশ কিছু আশংকার ব্যাপার সহজেই নজরে পড়বে। বলতে দ্বিধা নেই, ইতোমধ্যেই চিরাচরিত রেডিওর অস্তিত্ব চ্যালেন্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আর হয়তো সেই কারণেই, বিশ্ব বেতার দিবসের মতো একটি দিন গুরুত্বের সাথে পালন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে ইউনেস্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ও।
নিশ্চিতভাবেই রেডিওর রয়েছে এক গৌরবময় অতীতের ইতিহাস। মানবজাতিকে রেডিও তার সূচনালগ্ন থেকেই নানা ভাবে সেবা করে এসেছে। একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে মানুষের বিভিন্ন সংকটের সময়ে তার পাশে থেকেছে। বিশ্বের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক হয়েছে। গণতন্ত্রের বিস্তারে ও মানুষের ন্যায্য অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে দোসর হয়েছে। একটি স্বল্পমূল্যের শ্রবণ মাধ্যম হওয়ার সুবাদে রেডিও সহজেই পৌঁছে গেছে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, গরীব মানুষের রান্না ঘর অবধি। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বেতারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আজাদ হিন্দ রেডিও কিংবা প্রতিবেশী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকার কথা কেউই ভুলতে পারবে না। এ রকম নজীর রয়েছে আরও অনেক। আবার, ইতিহাস এটা ও সাক্ষ্য দেয়, অনেক সময়ই রেডিও ব্যবহৃত হয়েছে ক্ষমতাধরদের প্রচারণার যন্ত্র হিসাবে। তথাকথিত শীতল যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে (১৯৪৭ – ১৯৯১) সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকার বেতার প্রচারণার দ্বৈরথ বেতার শ্রোতাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। এমনকি আজ ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন জাতি, সম্প্রদায় বা ভাষা গোষ্ঠী – যারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে রত বেতারকে তারা ব্যবহার করে যাচ্ছে ব্যাপক মানুষের কাছে তাদের দাবি বা উদ্দেশ্যের কথা পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমাদের আশেপাশের দেশগুলোতেই এমন বেশ কিছু বেতারের প্রচার শোনা যেতে পারে। প্রসঙ্গক্রমে আমি Radio NUG, Mizzima Radio, Voice of Tibet, Radio Iran International, Afghanistan International TV ইত্যাদি বেতার কেন্দ্রগুলোর নাম উল্লেখ করতে পারি।
এখন প্রশ্ন হলো, এতো কিছুর পরেও কেন রেডিওর ভবিষ্যত নিয়ে আমি আশংকা প্রকাশ করছি। আসুন, সেটা একটু বুঝিয়ে বলি। বিগত দুই দশক ধরে বিশ্বব্যাপী শর্ট ওয়েভ বেতার সম্প্রচার বিস্তৃতির বদলে সংকুচিত হচ্ছে। অথচ বেতার সম্প্রচারকে দুর-দুরান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য শর্ট ওয়েভের জুড়ি মেলা ভার। ইতোমধ্যেই অনেক দেশ তাদের শর্ট ওয়েভ সার্ভিস পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। বাকিরাও তাদের অনুসরণ করছে একে একে। একদা, বিশ্বের জনপ্রিয় বেতার কেন্দ্রগুলোর প্রায় সবাই আজ ইতিহাসের পাতায়। এক্ষেত্রে, Radio Moscow, Radio Nederland, Radio Canada International, Radio Sweden International, Swiss Radio International, Radio Norway সহ অজস্র বেতারের নাম করতে পারি। BBC, Voice of America, Deutsche welle Germany র মতো বড় বেতার কেন্দ্রগুলো এখন পর্যন্ত নামসর্বস্ব হয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখলেও , যে কোন মুহুর্তে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যাবে। বাংলার শ্রোতারা আজ আর রেডিওতে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা কিংবা জার্মান বেতার তরঙ্গের খবর শুনতে পান না। এমনকি আমাদের আকাশবাণী ও সারা দেশে তাদের সমস্ত আভ্যন্তরীন শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিটার গুলো এক এক করে বন্ধ করে দিয়েছে। এসব ঘটনা কিসের বার্তা বহন করছে ?
আসলে ব্যাপার হলো, ইন্টারনেট যুগ শুরু হওয়ার পর থেকেই খুব দ্রুত দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। Broadcast এর জায়গা নিতে আসে podcast । স়ংশ্লিষ্ট সরকার বা বেতার কর্তৃপক্ষ দেখছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব কম খরচে অতি সহজে বিশ্বের সর্বত্র streaming service এর দ্বারা বেতার অনুষ্ঠানকে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এতে করে বিশাল অর্থ ব্যয় করে শর্ট ওয়েভ বা মিডিয়াম ওয়েভের ট্রান্সমিটার কেনার দরকার নেই। উপরন্তু, রক্ষনাবেক্ষনের খরচ ও নেই। উল্টোদিকে, শ্রোতাদের ও রেডিও কেনার দরকার পরছে না। হাতের মোবাইল সেটটি ই যথেষ্ট। আর এটা তো আজকাল সবার কাছেই রয়েছে। তাই, প্রায় সব বেতার সংস্থাই এখন নিজেদের অ্যাপ তৈরি করে নিয়েছে। তার পাশাপাশি রয়েছে ফেসবুকের লাইভ সম্প্রচার ব্যবস্থা । অতএব, চিরাচরিত রেডিও বেতার কর্তৃপক্ষ এবং শ্রোতা – সবার কাছেই যেন আজ ব্রাত্য।
এসব কিছু দেখেই, রেডিওর ভবিষ্যত নিয়ে আমি ভীত। যদিও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে হাত ধরে রেডিও সম্প্রচারে এফএম এবং ডি আর এম ইত্যাদি ব্যবস্থার বিকাশ ঘটানো হচ্ছে, কিন্তু সেটা কখনোই বৃহৎ অংশের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছবে না।
বিশ্ব বেতার দিবস আমাদের কাছে অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও রেডিও সম্পর্কে ভাবার, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব অনুভব করার সুযোগ এনে দেয়। মানুষের এই শতাব্দী – প্রাচীন সাথীটি যাতে একেবারে হারিয়ে না যায় সেটা মানুষকেই নিশ্চিত করতে হবে। এবারের বিশ্ব বেতার দিবসের এই বার্তা পৌঁছে যাক প্রতিটি ঘরে ঘরে, প্রত্যেকের কানে কানে।

;