পাড় ভাঙার শব্দে ঘুম ভাঙে নদীপাড়ের মানুষদের। রঙিন স্বপ্ন কিংবা বিত্তের কল্পনা কখনোই আঁচ করতে পারে না তাদের। নদীর সঙ্গে সন্ধি করেই জীবন পাড়ি দিতে হয়। কখনো এপার ভাঙে কখনো ওপার। এপার ওপারের ছোটাছুটিতে জীবনের আলো কখন ক্ষীণ হয়ে আসে কেউ টেরই পায় না। নদীর ভাঙা গড়ার চরম খেলায় জীবনের গতি থেমে যায় কখনো কখনো। ক্ষীণ হয়ে আসা অস্তিত্বের সংকট কাবু করে এসব মানুষদের। তবুও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরেই নদীর সঙ্গেই মিতালী পাতে চরের মানুষ।সরজমিনে বাংলাদেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা মেলে কালজানি নদীর কাছে পরাজিত মানুষদের মলিন মুখ। ভিটে মাটি আর ছেলে বেলার অসংখ্য স্মৃতি হারিয়ে বেদনা সিক্ত হয়ে পড়েছেন তারা। প্রতিদিন এখন পাড় ভাঙছে কালজানির। ভাঙছে মানুষের হৃদয়ও।
কথা হয় উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের শতবর্ষী হাসান আলী, সোনাভান, সামিয়া বেগম, সুরুজ্জামান, জাবেদা খাতুনের সঙ্গে। গ্রামটি ঘিরে তাদের হাজারো স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে তাদের। এক সময় ঘর ছিল, ফসলের জমি ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল এখন এসব কেবই স্মৃতি। কালজানি নদীর কাছে তারা পরাজয় বরণ করেছেন। ছোট বেলায় বেড়ে ওঠার স্থান এখন নদী গর্ভে। সহায় সম্পদ হারিয়ে এই মানুষগুলো চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। নদীর করাল গ্রাসে প্রায় বিলীন হওয়া এই গ্রামের কথা তুলে ধরলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। স্থানীয় শিলখুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন ইউসুফ, সদস্য আব্দুল মান্নান বাবুল বলেন, কালজানি নদীর পাড় প্রতিনিয়তই ভাঙছে। ধলডাঙ্গার অনেক পরিবার এই নদীর কাছে নিঃস্ব হয়েছে। আবাদী জমি, মসজিদ, ঈদগা মাঠ, রাস্তা, বসতবাড়ি, গাছপালা নদীর গর্ভে হারিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই মানুষগুলোর দিকে নজর দিয়ে পাড় বাধার উদ্যোগ নেবেন এমন অনুরোধ করেন তারা। স্থানীয় শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার বলেন, কালজানি নদী যেভাবে প্রতিদিন ভাঙছে তাতে যদি এখনি এই নদী শাসনের ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই পুরো গ্রাম, অবশিষ্ট স্থাপনা সবকিছুই বিলীন হয়ে যাবে। তিনিও সরকারের কাছে জোরালো অনুরোধ করেছেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
কালজানির ভাঙাগড়ার খেলায় পরাজিত হয়ে এই গ্রামের অনেক মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন চর, আশ্রয়কেন্দ্র ও বাঁধগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের কষ্ট দেখার মতো মানুষের বড়ই অভাব। ঘরহারা প্রিয়জনহারা এমন অসংখ্য মানুষের সন্ধান মেলে এই অঞ্চলে। রাত গভীর হলে কষ্টের শব্দগুলো স্পষ্ট হয়ে কানে বাজে তাদের। সব হারিয়ে নিঃস্ব এসব মানুষ জীবনের মানে খোঁজে আকাশ পানে তাকিয়ে। এতো কিছুর পরেও নদীকেই আপন করে নদীর বুকেই নিজেদের সমর্পণ করেন নদীপাড়ের এসব মানুষ। হাজারো স্মৃতিময় এই গ্রামটিকে রক্ষার আশ্বাসের বাণী শোনালেন কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাংসদ আসলাম হোসেন সওদাগর। তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলা মাঝে মধ্যেই নদীর ভয়াবহতার শিকার হয়। এমন ভয়াবহতার হাত থেকে মানুষদের রক্ষা করা খুব কঠিন। আমরা কালজানির তীর রক্ষার জন্য ৭১৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে উপস্থাপন করেছি। এটি পাস হলে কিছুটা হলেও রক্ষা করা যাবে নদীপাড়ের মানুষদের। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই বিল পাস হবে।