রাজীব হাসান কচিঃ
চুয়াডাঙ্গায় কৃষি কাজে ভর্তুকিমূল্যে বিতরণ করা কম্বাইন্ড হারভেস্টারের ব্যবহার বেড়েছে। রোপা-আউশ মৌসুমে হারভেস্টার ব্যবহার করে ধান কেটে কৃষকের শ্রমিকসহ অন্যান্য ব্যয় বাবদ প্রায় ৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৩৮ হাজার ৬৯৯ হেক্টর জমিতে রোপা-আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এ মৌসুমে ৩০ হাজার ৯৫৯ হেক্টর জমির ধান কৃষকরা কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে কেটেছে, যা আবাদের ৮০ শতাংশ।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রকৌশলী বিভাগের তথ্যমতে, জেলার ৪টি উপজেলায় ভর্তুকিমূল্যে এ পর্যন্ত জাপানী ইয়ানমার ২৩টি ও কুবোতা ২৫টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার বিতরণ করা হয়েছে। এ যন্ত্রগুলো সদর উপজেলায় ১৬টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ১৫টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ১০টি ও জীবননগর উপজেলায় ৭টি বিতরণ করা হয়, যার সুবিধা পাচ্ছে প্রান্তিক কৃষকরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জমি আবাদযোগ্য করে তুলতে, মাড়াই ও সংরক্ষণ কাজের প্রতিটি ধাপেই ব্যবহার হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ৯০ শতাংশ জমি চাষ, ৮০ শতাংশ সেচ কাজ, ৭০ শতাংশ ফসল উৎপাদন ও মাড়াই, ২ শতাংশ ফসল কাটা ও রোপণের এক শতাংশ ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। প্রকারভেদে যন্ত্রের চাহিদা আরও বাড়ছে।
সদর উপজেলার ডিহি কেষ্টপুর গ্রামের কৃষক নূর ইসলাম ইসলাম বলেন, গত দু’বছর আগে বৃষ্টির কারণে আড়াই বিঘা জমির ধার কাটতে না পারায় বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই যন্ত্রগুলো আসাতে সুবিধা হয়েছে। অর্ধেক খরচে অর্থাৎ ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় প্রতিবিঘা জমির ধান কাটা, কাটা অংশ বাঁধা ও মাড়াই করে বস্তায় ভরে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি। আগে লোকজন দিয়ে ধান কাটতে বিঘাপ্রতি ৬ হাজার থেকে ৭ টাকা খরচ হতো।
এখন অন্তত খরচের হাত থেকে আমরা বেঁচেছি। তা ছাড়া বৃষ্টি হলেও ধান কাটা নিয়ে আমাদের আর ভাবনা নেই। জমিতে যত বৃষ্টির পানিই থাকনা কেন, এ যন্ত্রের মাধ্যমে সহজেই ধান কাটা যাচ্ছে। একই উপজেলার শংকরচন্দ্র গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, কম সময়ে অল্প খরচে আমরা ধান কাটতে পেরেছি। বৃষ্টির পানির মধ্যে ধান কাটার জন্য কোন লোকজন পাওয়া যায় না। খরচ বেশি লাগে। এ সময়ে পানির মধ্যে ধান কাটা কষ্ট ছিল। এই যন্ত্র আসাতে এক ফুট পানির মধ্যেও ধান কেটে জমি থেকে আমরা বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। আমার ৪ বিঘা জমির ধান লোকজন দিয়ে কাটলে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হতো। এই যন্ত্রের কারণে ৪ বিঘা জমির ধান ১০ হাজার টাকা খরচে কেটে তা ২ ঘণ্টা রোদে শুকিয়ে হাটে বিক্রি করতে পেরেছি।
একই গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন, এ যন্ত্র দিয়ে ১০ বিঘা জমির ধান কাটিয়েছি। এই হারভেস্টার মেশিন কৃষকদের জন্য লাভজনক। লোকজন দিয়ে ধান কাটতে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হতো। কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কেটে ১০ হাজার টাকা খরচ করে ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গড়াইটুপি ইউপি চেয়ারম্যান সফিকুর রহমান রাজু বলেন, এ ইউনিয়নে বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৬০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার যন্ত্র ধান কাটার কাজে সহযোগিতা করছে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সঠিক সময়ে কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারে না। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। সঠিক সময়েই কৃষক তাদের উৎপাদিত ধান জমি থেকে নিয়ে যেতে পারছে। সব মিলিয়ে সরকার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেটা যুগোপযোগী। চুয়াডাঙ্গা জেলা কম্বাইন্ড হারভেস্টার মালিক সমিতির সভাপতি নূর আলম লিটন জানান, কম্বাইন্ড হারভেস্টারের কারণে কৃষকরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন, আমরাও তেমনি কৃষকের ধান কেটে দিয়ে লাভবান হচ্ছি।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, কম্বাইন্ড হারভেস্টারের বড় সুবিধা মাত্র এক ঘণ্টায় ৩ বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াই করে বস্তাবন্দী করে ঘরে তুলে দিতে পারা। বৈরী আবহাওয়ায় এই যন্ত্রের সাহায্যে ধান কাটা সম্ভব। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার করে কাটা হয়েছে। রোপা-আউশ মৌসুমে হারভেস্টার ব্যবহার করে ধান কেটে কৃষকের প্রায় ৭০ কোটি টাকার শ্রমিকসহ অন্যান্য ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে এই কম্বাইন্ড হারভেস্টার যন্ত্র কৃষকদের দেয়া হচ্ছে।