সেলিম আবেদ,খুলনা সংবাদদাতা
খুলনার ডুমুরিয়া শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে ২টার দিকে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে উপজেলা সদরে হাতে ব্যাগ, পিঠে পুঁটলা বাঁধা মানুষের ভিড় দেখা যায়। এরা , যশোর, সাতক্ষীরা পাইকগাছা, কয়রা,আশাশুনি সহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রান্তিক অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে আসা অভাবি মানুষ। তবে প্রতি শুক্র ও সোমবারে ডুমুরিয়া বাজারের কালিবাড়ী মোড়ে শ্রম বিক্রির হাটে ( কিষেন হাট) মানুষের ভিড় হচ্ছে অনেক বেশি।এই শ্রম বাজারটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
শত শত শ্রমজীবী মানুষ হাটে আসেন বিক্রি হতে এবং উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গৃহস্ত মানুষ কৃষিকাজের জন্য তাদের কিনে নেন। চলতে থাকে অন্যান্য পণ্যের মতো দর-কষাকষি। দুপুরের দিকে চাহিদা বেশি থাকে। শ্রমজীবীরা দামও বেশি পান। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে চাহিদা কমে যায় এবং দামও কমে আসে।স্থানীয়ভাবে শ্রমজীবীদের বলে ‘দিনমজুর’, আবার কেউ বলে ‘কামলা’ বা ‘কিষেন’। ১৮ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে ৭৫ বছরের বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সের শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে দলে দলে ছুটে আসেন এ হাটে। এ মানুষগুলোর বেশিরভাগই হতদরিদ্র শ্রমজীবী। ক্রেতাদের কাছে তারা কেউ কেউ এক সপ্তাহ আবার কেউ কেউ একমাস চুক্তিতে ধান ক্ষেতে রোপণ, পরিচর্যা ও ধান কাটা, সবজি চাষাবাদের জন্য বিক্রি হন। আমন-বোরো ক্ষেত চাষাবাদের সময় এ অঞ্চলে দিনমজুর বা কৃষিকাজের মানুষের বরাবরই অভাব থাকে। সোমবার ৬ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে খুলনা/সাতক্ষীরা মহাসড়ক ডুমুরিয়ার কালিবাড়ি গিয়ে দেখা গেল, হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি। শ্রমিক ক্রেতার গৃহস্তের সংখ্যাও অনেক। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা চুক্তিতে শ্রম বিক্রি হচ্ছে। তবে শ্রম কেনা মালিকের পছন্দের ওপর নির্ভর করে শ্রমের মূল্য। বৃদ্ধের চেয়ে জোয়ানদের চাহিদা বেশি। তবে অনেকে শরীরের গঠন দেখেও ক্রয় করেন। এ যেন পণ্য বিক্রির হাট। বিক্রি হতে আসা শ্রমজীবী মানুষ যেদিন নিজেকে বিক্রি করতে না পারেন, সেদিন তাদের রাত কাটে বাজারের কাছাকাছি মসজিদ, মাদরাসা অথবা স্কুলের বারান্দায়। কখনো থাকেন আধা পেটে, কখনো উপোস। সকাল থেকেই ফের বিক্রি হওয়ার আশায় শুরু হয় ছোটাছুটি। শ্রমজীবীরা জানান বাজারে বিক্রি হতে আসা সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলকার বয়োবৃদ্ধ রফিকুল মিয়া( ৬৫) জানান, কৃষিকাজেই ব্যয় হয়েছে তার যৌবনকাল। এ সময়টায় অবসরে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে এখন ডুমুরিয়ার শ্রম বিক্রির হাটে। এখানে শ্রম বিক্রির জন্য জড়ো হয়েছেন তার মতো আরও শত শত অভাবী মানুষ। কাশেম আলী ফকির (৭৫) খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা। চার ছেলেমেয়ের মধ্যে একমাত্র ছেলে স্থানীয় একটি মাদরাসায় লেখাপড়া করে। অভাবের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। জমিজমাও তেমন নেই। বর্গাচাষ করেই চলে সংসার। কিন্তু ঘরে খাবার নেই। এলাকায় কাজও নেই। তাই কাজের সন্ধানে তিনি হাটে এসেছেন। তিনি আরও জানান, তার ঘরে পাঁচজন মানুষ, শরীরও খারাপ। তারপরও অভাবের তাড়নায় কাজের খোঁজে এসেছেন। এখানে মানুষ বেশি, কাজ পাওয়া যায় বেশি। তার দুঃখ বৃদ্ধ হওয়ায় অনেকেই তাকে কাজে নিতে চান না।কাজের সন্ধানে আসা সাতক্ষীরার পাইকগাছা উপজেলার আবুল হোসেন, তোফাজ্জেল হোসেন, আবু বকর সহ অনেকে বলেন, এসময় গ্রামের বাড়িতে কোনো কাজকর্ম নেই। তাই এ অঞ্চলে কাজের সন্ধানে তারা ছুটে এসেছেন।