ই-পেপার | শুক্রবার , ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
×
;

নয়া দৌড়-এ ইউসুফ নজর ঢাকার পতন এবং পাকিস্তানের আংশিক স্মৃতিভ্রম

৪৯ বছর পরেও পাকিস্তানিরা এবং বাংলাদেশিরা একাত্তরের ঘটনাটিকে যেভাবে দেখে তার মধ্যে এখনো একটি বড় ফারাক রয়েছে। রয়েছে প্রায় বিপরীত মতামত-ও। পাকিস্তানের বাইরে খুব কম লোকই এই পরাজয়কে ‘ঢাকার পতন’ বলে থাকেন। এটি বাংলাদেশের জন্মদিন হিসেবে এবং বিজয় দিবস হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যেদিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

গতকাল পাকিস্তানের ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম ‘নয়া দৌড়’ এ ‘ফল অফ ঢাকা এন্ড পাকিস্তান’স সিলেক্টিভ এমনেসিয়া’ শীর্ষক এক নিবন্ধে ইউসুফ নজর এসব কথা লিখেছেন। ইউসুফ পাকিস্তানের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তিনি “বালকানাইজেশন এন্ড পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ পাকিস্তান” বইয়ের লেখক। তার সম্পূর্ণ লেখাটি:

শেখ মুজিবুর রহমানের ‘পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার দিন’ হিসেবে ২৬শে মার্চকে বাংলাদেশ উদ্‌যাপন করে। একাত্তরের ২৬শে মার্চ ভোরের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সামরিক অভিযান শুরু করে যা পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনার সূচনা করে।

কয়েক বছর পর জানা যায়, ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার এক মাস আগেই ১৯৭১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া সরকার সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অনেক পাকিস্তানিই বাংলাদেশের জন্মকে ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপ অথবা ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে দেখেন, তবে এটি গল্পের একটি অংশ মাত্র। একাত্তরের মার্চে সামরিক অভিযানের শুরু থেকেই সেনা হাই কমান্ড পূর্ব পাকিস্তানকে শত্রু অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেছিল। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি কমান্ড গ্রহণের প্রথমদিনই তার অধস্তনদের বলেছিলেন: “র‌্যাশনের অভাব নিয়ে আমি এসব কি শুনছি? এদেশে কোনো গরু-ছাগল নেই? এটি শত্রু অঞ্চল। যা চাও, নিয়ে নাও। আমরা বার্মায় এ কাজই করতাম।’’

অখণ্ড পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাস জনপ্রিয় এবং জ্ঞানগর্ভ উভয় ধরনের বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে অখণ্ড পাকিস্তানের ভাগ্য তখনই শেষ হয়েছিল যখন একটি বর্বর সেনা অভিযান সংঘাতকে ‘কখনোই আর আগের অবস্থায় না ফেরার জায়গায়’ নিয়ে যায় এবং সমঝোতা বা নিষ্পত্তির সম্ভাবনাও নষ্ট করে দেয়।

এই প্রসঙ্গে, এটি স্মরণ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ৩রা মার্চের মধ্যে আওয়ামী লীগ ফেডারেল সরকারের কর্তৃত্বকে পঙ্গু করে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। ওই সময়কালে অবাঙালি সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধে বড় রকমের সহিংসতা চালানো হয়েছিল। যাই হোক, হামুদুর রেহমান কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তথ্যগুলোকে ‘পূর্ব পাকিস্তানে অভিযানের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত নৃশংসতা বা অন্যান্য অপরাধ’ এর ন্যায্যতা হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে: ‘সামরিক অভিযানের সেই প্রথম দিনগুলোতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তা কখনোই মেরামত করা যায়নি এবং সামরিক নেতারা ‘চেঙ্গিস খান’ এবং ‘পূর্ব পাকিস্তানের কসাই’ খেতাব অর্জন করেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর (আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত) গণহত্যার শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যাটি ৩ লাখ থেকে শুরু করে ৩০ লাখের মধ্যে রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে যায়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) নথি অনুসারে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে যাওয়া প্রায় ১ কোটি মানুষ, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে (১৯৫০-২০০০) শরণার্থীদের বৃহত্তম একক বাস্তুচ্যুতির জন্ম দেয়।

১৯৭১ সালের ৩১শে মার্চ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ‘গণতান্ত্রিক জীবনের সংগ্রামে পূর্ববাংলার জনগণের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সংহতি’ নামে ভারতীয় সংসদে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করেন; যেটা দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিল যে, ‘তাদের সংগ্রাম ও ত্যাগ ভারতের জনগণের আন্তরিক সহানুভূতি এবং সমর্থন পাবে’।
১৯৭১ সালের ৩রা এপ্রিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম এসবে জড়ায় যখন প্রেসিডেন্ট  পডগর্নি ‘মুজিবুর রহমান এবং অন্য রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, ‘যারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন’।

১৯৭১ সালের ১৬ই এপ্রিল ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের  রাষ্ট্রদূত কেনেথ কেটিংকে বলতে শোনা যায়, পরিস্থিতি বিশ্বের জন্য উদ্বেগজনক এবং এটিকে পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
একাত্তরের জুনে, বৃটিশ সরকার পাকিস্তানকে এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত সব সহায়তা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ১৯৭১ সালের ২১শে জুন প্যারিসে বিশ্বব্যাংক কনসোর্টিয়ামের বৈঠকেও পাকিস্তানকে সহায়তা প্রদান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

একাত্তরে গ্রীষ্মের কাছাকাছি সময়ে, সেনাবাহিনীর হাইকমান্ড আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিল না বলেই মনে হয়। এটা নিয়ে সন্তুষ্টি ছিল যে মুক্তিবাহিনীকে পূর্ব পাকিস্তানের বেশির ভাগ অঞ্চল থেকে (রাজশাহীর উত্তরের কয়েকটি শক্ত জায়গা বাদে) বিতাড়িত করে দেয়া হয়েছিল। তবে মুক্তিবাহিনী তখন পুরোপুরি পরাজিত হয়নি। তারা পুনরায় দলবদ্ধ হতে এবং প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র গ্রহণের জন্য ভারতে চলে গিয়েছিল।

ভারত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বা চীনা হস্তক্ষেপে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায়, একাত্তরের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির মূল অংশটি ছিল, ভারতের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজের বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে মনে করবে।

তবে ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা বিস্ময়করভাবে দাম্ভিকতার সঙ্গে কাজ করছিল এবং পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল। মোহাম্মদ ইউনূস (একাত্তরে পাকিস্তানের একজন ফরেন সার্ভিস অফিসার) তার ‘ভুট্টো এন্ড দ্য ব্রেকাপ অফ পাকিস্তান’ বইয়ে বর্ণনা করেছেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান কীভাবে মাতালের মতো অহমিকায় একাত্তরের যুদ্ধের সময় চীনের মাও জেদং এর আমন্ত্রণকে উপেক্ষা করেছিলেন। ইয়াহিয়া ইরানের শাহ এর-ও বিরোধিতা করেছিলেন এবং শাহ কর্তৃক আয়োজিত একটি বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট যখন ইরানে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন সেখানে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা লাভের বিরল সুযোগও হারান। ইয়াহিয়ার আচরণ পাকিস্তানকে এতোটাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল যে ইউনূসের মতে, চীনারা পূর্ব পাকিস্তানে প্রয়োজনীয় বিমান সরবরাহ করতে অস্বীকার করেছিল।

১৯৭১ সালের নভেম্বরের মধ্যে ইয়াহিয়া রেজিম হয়তো তার ভুলত্রুটির পরিমাণ বুঝতে পেরেছিল,  কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইয়াহিয়া ভুট্টোকে চীনে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে একটি উচ্চ-স্তরের সামরিক মিশনের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, যার মধ্যে এয়ার ফোর্স কমান্ডার-ইন-চিফ রহিম খান এবং আর্মি চিফ অফ জেনারেল স্টাফ গুল হাসান খান ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৫ই নভেম্বর থেকে ভুট্টো তিনদিনের জন্য চীনে ছিলেন, যদিও তিনি তখন কোনো সরকারি পদে ছিলেন না।

হেনরি কিসিঞ্জার ২০১৬ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছিলেন যে, ১৯৭১ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট (ইয়াহিয়া) নিক্সনের সঙ্গে পরের মার্চ মানে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে (বাংলাদেশকে) স্বাধীনতা দেয়ার জন্য একমত হয়েছিলেন। এদিকে, ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিকভাবে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন এবং ২২শে নভেম্বর ভারতীয় পদাতিক বাহিনী ট্যাঙ্কের সমর্থনে সীমানা পেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে এগিয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর ভোর ৬টার দিকে, পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ওয়েস্ট উইং থেকে এগারোটি ভারতীয় বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায়, যার ফলে পুরো মাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়,  যা মাত্র ১৩ দিন স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এবং জেনারেল নিয়াজীকে সিগন্যাল নং জি -০০১৩ প্রেরণ করেছিলেন:

‘আপনারা অভূতপূর্ব অদ্ভুত (.) কিছুর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেছেন, জাতি আপনাদের নিয়ে গর্বিত এবং বিশ্ব প্রশংসায় পঞ্চমুখ (.) সমস্যার  গ্রহণযোগ্য সমাধানে আমি মানবিকভাবে যা কিছু সম্ভব করেছি (.) আপনারা এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে মানবিক কোনো প্রতিরোধ আর সম্ভব নয়, এর কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য-ও নেই (.) আপনাদের এখন যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সবার জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’ যুদ্ধটি কার্যত ১১ দিনের মধ্যেই শেষ হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিপক্ষে দাঁড়াতে পারেনি, যাদের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল।
পাকিস্তান শুধু নিজেকে পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া একাত্তরের ঘটনাবলির নির্বাচিত কিছু অংশ মনে করে থাকে। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে বিজয় দিবস উদযাপিত হয়।

সুত্রঃ মানবজমিন

;