প্রায় ২৩ বছর আগে বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে যান বগুড়ার আমেনা বেগম। সে থেকে নিখোঁজ তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাচ্ছিলেন না স্বজনরা। তারা ধরে নিয়েছিলেন আমেনা হয়তো মারা গেছেন! কিন্তু না, আমেনা মারা যাননি। তিনি পাচার হয়েছিলেন নেপালে। সেখানে বাসাবাড়িতে কাজ করেছেন বহু বছর। কিন্তু বয়সের ভারে ন্যুব্জ আমেনার নিজের শরীরই এখন আর চলে না, বিধায় তিনি কর্মহীন-নিরাশ্রয় হয়ে পড়েন। পথে পড়া ওই নারীকে দেখে মায়া হয় সুনসারি মিউনিসিপ্যালিটির ডেপুটি মেয়রের।
তিনি তাকে আশ্রয় দিয়ে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন। সেই স্ট্যাটাসের সূত্রেই বিষয়টি নোটিশে আসে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসের। নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই শেষে গতকাল আমেনাকে ফেরানো হয়েছে তার জন্মমাটিতে। পাচারের শিকার আমেনাকে ফেরানোর ওই প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কাঠমান্ডু মিশনের তত্ত্বাবধানে। সুনসারি সিটির ডেপুটি মেয়র নিজের গাড়িতে করে তাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়েছেন। আর ঢাকা হয়ে বগুড়ার ধুনট উপজেলার মাজবাড়ি গ্রামে তার নীড়ে ফেরার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করেছে বাংলাদেশ সরকার। বেলা ১টার দিকে ফ্লাইটযোগে নেপালের বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মো. মাসুদ আলম আমেনাকে নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরআগে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমেনাকে বিদায় জানান সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী। নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ১লা সেপ্টেম্বর একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠি থেকে জানা যায়, আমেনার বয়স এখন ৮০ বছর। নেপালের কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে সুনসারি জেলায় প্রায় তিন মাস আগে তার সন্ধান মেলে। পরে নেপালে বাংলাদেশের দূতাবাস তাকে উদ্ধার করে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। স্থানীয়ভাবে যাচাইকৃত তথ্যমতে, আমেনার স্বামী মৃত আজগর আলী প্রামাণিক পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে আমজাদ হোসেনের বয়স ৬০ বছর, মেজো ছেলে ফটিক হোসেনের বয়স ৫৮ বছর, ছোট ছেলে ফরাজুল হোসেনের বয়স ৫৪ বছর ও ছোট মেয়ে আম্বিয়া খাতুনের বয়স ৪৫ বছর। আমেনা খাতুনের বড় ছেলে আমজাদ হোসেন বলেন, তিন মাস আগে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানতে পারি, নেপালে আমাদের মাকে পাওয়া গেছে। এরপর আমরা তাকে সরকারি খরচে দেশে ফেরানোর জন্য আবেদন করি। নেপালে বাংলাদেশের দূতাবাস তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু করোনা ও লকডাউনের কারণে মায়ের দেশে ফেরা দেরি হয়। ইতিমধ্যে নেপালে বাংলাদেশি দূতাবাসের সহযোগিতায় মুঠোফোনে ভিডিও কলে মায়ের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তিনি আমাদের চিনতে পেরেছেন। আমরাও তাকে চিনেছি। মাসুদ বলেন, মাকে আনতে চার ভাইবোন ও স্বজনেরা মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঢাকায় গিয়েছিল। যে মা সবার কাছে মৃত হয়ে গিয়েছিলেন, সেই মাকে এত বছর পর ফিরে পাওয়ার আনন্দ-অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মো. মাসুদ আলমের ইস্যু করা চিঠির সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের ৩০শে মে নেপালে বাংলাদেশি দূতাবাস আমেনা খাতুনের সন্ধান পায়। তিনি নেপালের সুনসারি জেলার ইনারোয়া শহরে বাসাবাড়ি ও হোটেলে কাজ করতেন। বার্ধক্যের কারণে তিনি কাজ করতে না পেরে রাস্তাঘাট ও ফুটপাথে অবস্থান করছিলেন। পরে ইনারোয়া পৌরসভার কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে সুনসারি জেলা প্রশাসনের সেফ হাউজে রাখেন। নেপালের এক ব্যক্তি ফেসবুকে বিষয়টি পোস্ট করেন (তিনি সুনসারি সিটির ডেপুটি মেয়র বলে পরিচয় পায় মিশন)। ওই পোস্টে তিনি আমেনাকে বাংলাদেশি বলে উল্লেখ করেন। পোস্টটির কমেন্টে নেপালে বাংলাদেশ ইয়ুথ কনক্লেভের চেয়ারম্যান অভিনাভ চৌধুরী বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় বগুড়ার ধুনটে তার পরিবারের খোঁজ মেলে।
অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট