প্রদীপ চন্দ্র কুন্ডু
ভট্টপুকুর, নিবেদিতা সংঘ
অরুন্ধতীনগর 799003
আগরতলা, ত্রিপুরা, ভারত।
“সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়…।” ঠিক তাই। দেখতে দেখতে ৬২ বছর হয়ে গেল ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা অনুষ্ঠানের। আজ সে প্রৌঢ়। মনুষ্য জীবনে ষাটোর্ধ্ব হওয়ার পরে অনেকের মনের কোণেই বার্ধক্যের ভীতি, এমন কি মৃত্যুর অজানা আশংকা ও উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করে। বালাই ষাট। আমাদের আদরের ধন ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা অনুষ্ঠানের বেলায় যেন এমনটি না হয়।
সে অনেক বছর আগের কথা। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছি। হঠাৎ একদিন সোরগোল – মানুষ নাকি চাঁদের বুকে পা রেখেছে ! এ ও কি সম্ভব ! গ্রামের ধর্মভীরু সরল মানুষগুলি তো বিশ্বাসই করে নি। তখন টিভি ছিল না, এমন কি গ্রামের মানুষ দৈনিক খবরের কাগজ ও চোখে দেখতো কালেভদ্রে। এমন সময় স্কুলের এক স্যার নিয়ে এলেন চন্দ্র বিজয়ীদের সুদৃশ্য রঙ্গিন ছবি। আমাদের কৌতূহল নিরসনে জানালেন তিনি নাকি ঐ ছবি পেয়েছেন ভয়েস অব আমেরিকা থেকে। সেই প্রথম শুনলাম এই বেতারের নামটি।
তার এক দশকের ও বেশি পরের কথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। আমরা ত্রিপুরাবাসী এই যুদ্ধের
সাথে ওতপ্রোতভাবেভাবে জড়িয়ে। চোখের সামনে হাজার হাজার শরণার্থী। তাদের শিবির, মুক্তিফৌজের ট্রেনিং ক্যাম্প, দৌড়ঝাঁপ, যুদ্ধ বিমানের আসা যাওয়া, বোমা ফেলা – সবই আমরা সেদিন প্রত্যক্ষ করেছি। ক্ষণে ক্ষণে শিহরিত হয়ে উঠেছি। ততদিনে গ্রামে দু-একটি রেডিও এসে পড়েছে। সকাল সন্ধ্যা সেই রেডিওর সামনে ভীড়। সবাই শুনতে চায় কি বলছে বিবিসি, কি খবর দিচ্ছে ভয়েস অব আমেরিকা। বিশেষ করে সবারই নজর তখন পরাশক্তি আমেরিকা কি পদক্ষেপ নেয় সেদিকে। আমার মনে হয়, গ্রাম বাংলার ব্যাপক অংশের সাধারণ মানুষের কাছে ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা অনুষ্ঠানের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার শুরু সেখান থেকেই।
দিনে দিনে ভিওএ বাংলার শ্রোতা সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের কাছে সে আপন থেকে আপনতর হয়ে উঠেছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই অনেক কারণ রয়েছে। শুধু মাত্র আমেরিকার নাম ভাঙ্গিয়েই এই সাফল্য আসে নি।
ভিওএ বাংলা এই উপমহাদেশের অগণিত বাংলাভাষী
শ্রোতাদের চাহিদাকে শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। ঢাকা, কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে তাদের নির্বাচিত সংবাদদাতারা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নির্ভেজাল নিরপেক্ষ রিপোর্ট প্রতিদিন অনুষ্ঠানে তুলে ধরছেন। এই এলাকার মানুষদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয় তাদের কাছে যথাযথ গুরুত্ব পায়। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ও নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদকে বৃহত্তর জনমানসে পৌঁছে দিতে ভিওএ বাংলা সদা সক্রিয়। এই অনবদ্য ভূমিকা পালন করেই ভিওএ বাংলা জনপ্রিয়তায় অন্য বিদেশী বেতার সংগঠনগুলিকে ছাপিয়ে গেছে।
এ যাবৎ কাল অবধি ভিওএ বাংলার কার্যক্রমের দিকে তাকালে আমরা দেখতে অনেক গুণীজন, কৃতী ব্যক্তিত্ব এখানে যুক্ত হয়েছেন। তারা শুধু যে সমৃদ্ধ অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছেন তা-ই নয়, শ্রোতাদের সাথে ও গড়ে তুলেছেন নিবিড় আত্মীয়তার সম্পর্ক। ইকবাল বাহার চৌধুরী থেকে শুরু করে দিলারা হাসেম, কাফি খান, রোকেয়া হায়দার, মাসুমা খাতুন, সরকার কবিরউদ্দিন, আরও কত নাম! কাকে ছেড়ে কার কথা বলব! এদের প্রত্যেকের অবদানে, আন্তরিক প্রচেষ্টায় ভিওএ বাংলা এক সফল ইতিহাস রচনা করতে সমর্থ হয়েছে। তাই আমার বিবেচনায় ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা অনুষ্ঠানের অতীত, সোনালী অতীত, রঙ্গিন অতীত।
গত এক বছরে করোনা দানব গোটা পৃথিবীর অনেক কিছুই তছনছ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বেতার সম্প্রচার ব্যবস্থা ও এই হামলা থেকে রক্ষা পায় নি। আবার সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে পৃথিবীটা পুরোনো চেহারায় ফিরে যাবে সেই সম্ভাবনা যেন দিন দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। হয়তো সে দিকে খেয়াল রেখেই ইউনেস্কো এ বছরের বিশ্ব বেতার দিবসের থিম নির্বাচন করেছে – “নয়া বিশ্ব, নয়া বেতার “। পরোক্ষে তারা এক নতুন পৃথিবীর ইঙ্গিত দিয়ে সেখানে নতুন বেতার ব্যবস্থার বার্তা আমাদের দিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় ভিওএ বাংলা অনুষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস দিতে পারছি না বলে দুঃখিত। এমনিতেই ইন্টারনেটের দাপটে চিরাচরিত বেতার সম্প্রচার ব্যবস্থা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ব্যয়বহুলতার দোহাই দিয়ে নয়তো আধুনিকতার অজুহাত দেখিয়ে অনেক দেশ তাদের শর্ট ওয়েভ বেতার প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ নামমাত্র মিডিয়াম ওয়েভ বা এফ.এম সম্প্রচার চালু রাখলে ও যে কোন মুহূর্তে তা গুটিয়ে নেবে। ইন্টারনেট, ফেসবুক জাতীয় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচার ব্যবস্থা চালু রাখার দিকেই সবার ঝোঁক। ইতোমধ্যেই অনেকে সে ব্যবস্থায় চলে গেছেন। আমাদের ভয়েস অব আমেরিকা ও শর্ট ওয়েভ সম্প্রচার অনেক কাটছাঁট করে ফেলেছে। অতীতের পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে রিলে কেন্দ্রগুলি ছিল, তার অনেকগুলিই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলা অনুষ্ঠান শর্ট ওয়েভ থেকে তুলে নিয়ে শুধু মিডিয়াম ওয়েভ নির্ভর করে দেওয়া হয়েছে। সময় কমে এখন স্রেফ তিরিশ মিনিটে এসে দাঁড়িয়েছে। করোনার কারণে অনেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান এখন বন্ধ। এ সব কিসের লক্ষণ? ঈশান কোণে অশনি সংকেত নয় তো?
তাই শেষ করবো এই আশা ব্যক্ত করে, আমাদের আদরের ধন ভিওএ বাংলা রেডিওতে গমগম করে বাজবে আরো বহু কাল, আমরা প্রাণভরে শুনব। কিন্তু মন বলছে ভিন্ন। মৃদু স্বরে কর্ণকুহরে তার সাবধান বাণী – সোনালী অতীত নিয়ে উচ্ছসিত হয়ো না, বাপু, ভবিষ্যত কিন্তু ধূসর, ধুমিল।
বিশ্ব বেতার দিবস ২০২১ উপলক্ষে আপনাদের ক্লাব আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আমার এই রচনাটি পাঠালাম।